হেরোইন নেশা এতটাই তীব্র ব্যাকুলতা, হেরোইন কেনার জন্য সামান্য টাকা পেতে খুন
- আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবসে ফিরে দেখা
- বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে লিখছেন বিশিষ্ট পুলিশ অফিসার
অরূপ কুমার রায়
তারিখটা ঠিক মনে নেই কিন্তু সালটা ২০০৬, আমি তখন বহরমপুর থানায় কর্মরত। একদিন ডিউটি করতে করতে ভোরবেলায় খবর পেলাম চুয়াপুর মোড়ে কেউ একজন খুন হয়ে গেছেন। সাথে সাথে সেখানে দৌড়াই। দেখি খবরটা সত্য, এক ব্যক্তি মৃত অবস্থায় এক দোকানের বন্ধ সাটারের দরজার সামনে পড়ে। গলায় ছুরি দিয়ে কোপানোর দাগ, রক্ত বেরিয়ে সিমেন্টের চাতালে অনেক টা গড়িয়ে থকথকে জমে আছে। মৃতদেহে সদ্য খুনের ছাপ স্পষ্ট। সেই খুনের তদন্তে যেটুকু বেরিয়ে এসেছিল, যে মৃত ব্যক্তির এক নিকট আত্মীয় সেদিন বহরমপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি ছিলেন । তখন অবশ্য বহরমপুর হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ হয়নি। সেই ভর্তি থাকা আত্মিয়ের জন্য রক্ত সংগ্রহ করতে পকেট এ ৪০০/৫০০ টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলেন রক্তদাতার খোঁজে। গন্তব্য ছিল ভাকুড়ি। চুয়াপুর মোড়ে এক হেরোইন আসক্ত ব্যক্তির সম্মুখীন হন তিনি। সেই আসক্ত ব্যক্তির হেরোইন এর জন্য এতটাই তীব্র ব্যাকুলতা, হেরোইন কেনার জন্য,ওই সামান্য টাকা পেতে মরিয়া হয়ে সে ওই ব্যক্তিকে খুন করেন। এটা কোন গল্প নয়, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়।মাদকাসক্ত ছেলের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পিতা থানায় আশ্রয় নিয়েছে বাঁচার আর্তি নিয়ে, এ আমি স্বচক্ষে দেখেছি।নেশাখোর স্বামীর ঘরের সব জিনিস একে একে বিক্রি করে দিয়ে শেষকালে ছাউনির টিন ও বিক্রি করে দিয়েছে, এই অভিযোগ অসহায় স্ত্রী কে করতে দেখেছি। মাদকাসক্ত মানুষের কারণে শুধু বাড়ির লোকেরাই পীড়িত নয়। প্রতিবেশী, সমাজ সবাই ভুক্তভোগী। মুর্শিদাবাদের মত সীমান্তবর্তী জেলায় পুলিশ ও বি এস এফ নিয়মিত নজরদারি সত্ত্বেও হেরোইন ও ফেনসিডিল কারবারিরা অত্যন্ত সক্রিয়।
যুব সমাজের একটা অংশ অন্যান্য মাদকের পাশাপাশি এই দুই সাইকোট্রপিক ড্রাগে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা এত ভয়ঙ্কর এই কারণে এতে একবার আসক্তি হলে তার থেকে সহজে মুক্তি নেই। দ্বিতীয়তঃ এর বিশেষত্ব এইযে,এতে আসক্ত ব্যক্তির নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ডোজএর মাদক না পেলে তার মধ্যে যে সাইকো বায়োলজিক্যাল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় তাতে সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যায় এবং সেই ব্যক্তি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেন না। সেসময় মাদকের জন্য খুন করা তার কাছে তুচ্ছ কাজ।ধারাবাহিক ভাবে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে না থাকলে হেরোইন আসক্ত কে সমাজের মূলপথে ফিরিয়ে নিয়ে আসা খুব কঠিন । আমাদের এই জেলাতে ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের অভাবও প্রকট। বিভিন্ন সমস্যা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকা আমাদের যুব সমাজের একটা বড় অংশকে মাদকের হাতছানি থেকে দূরে রাখতে সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয়তা অত্যন্ত জরুরী। "বিশ্ব মাদক ও মাদক পাচার বিরোধী দিবস"এর দিন ,নিজ নিজ এলাকায় মাদক বিক্রেতা ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আপোষহীন প্রতিরোধ গড়ে তোলার ভাবনাই হোক আজকের অঙ্গীকার।