অক্সিজেন আমাদের জলজ বাস্তুতন্ত্রে লিমিটিং ফ‍্যাক্টর। দেখা হবে মহামারীর শেষে!

30th May 2021 9:04 pm শিক্ষা- জীবনচর্চা
অক্সিজেন আমাদের জলজ বাস্তুতন্ত্রে লিমিটিং ফ‍্যাক্টর। দেখা হবে মহামারীর শেষে!


অক্সিজেন আমাদের জলজ বাস্তুতন্ত্রে লিমিটিং ফ‍্যাক্টর। দেখা হবে মহামারীর শেষে!

 à¦¡. কুনাল সরকার 

গত দু বছর ধরে পৃথিবী জুড়ে করোনা ভাইরাসের মহামারী আমাদের তটস্থ করে রেখেছে। আমরা তো বটেই, আমাদের বাবা, দাদুদেরও এইরকম মহামারীর অভিজ্ঞতা এই প্রথম। আমরা অনেকেই জানি না যে আমাদের স্হলজ  বাস্তুতন্ত্রে সাধারণ  ভাবে অক্সিজেন কখনোই লিমিটিং ফ‍্যাক্টরে পরিনত হয় না। লিমিটিং ফ‍্যাক্টর বলতে বোঝায় কোনো একটা উপাদানকে সহ‍্য করবার সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন সীমা। যখন কোনো একটা উপাদান আমাদের সহ‍্য  করবার সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন সীমাকে অতিক্রম করে যায় তখনই সেই উপাদানটা আমাদের কাছে লিমিটিং ফ‍্যাক্টরে পরিনত হয় অর্থাৎ আমরা উপাদান টার অভাব অথবা আধিক‍্য অনুভব করি। যেমন এই স্হলজ বাস্তুতন্ত্রে তাপমাত্রা এবং আদ্রতা প্রায় লিমিটিং ফ‍্যাক্টরে পরিনত হয়। যদি অক্সিজেন স্হলজ বাস্তুতন্ত্রে লিমিটিং ফ‍্যাক্টর হতো তাহলে আজকে আমাদের অক্সিজেনের জন্য যে অবস্থা হচ্ছে তা আমাদের প্রতিনিয়ত জীবনে ঘটত। যেভাবে ধরুন রাতের বেলা যেমন ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ পরিবেশে তাপমাত্রার পরিবর্তনের জন‍্য ফ‍্যানটা কমিয়ে দিতে হয় বা গায়ে চাদর দিতে হয়, ঠিক তেমনই হঠাৎ করে অক্সিজেন মাস্ক মুখে দিতে হত। রাস্তাঘাটে বেরানোর সময় পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হতো, হঠাৎ অক্সিজেন কম বেশি হলেই অক্সিজেন নিতে হতো। বাড়িতে জলের পাইপ লাইন এর মতো অক্সিজেনের পাইপ লাইন রাখতে হত। কিন্তু এই প্রকৃতির আশীর্বাদ আমাদের এই বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা করেছে। 

  • ভাবতে অবাক লাগবে আবার এই অক্সিজেন আমাদের জলজ বাস্তুতন্ত্রে লিমিটিং ফ‍্যাক্টর। কিন্তু এই করোনা অতিমারিতে এই অক্সিজেন ঘরে ঘরে জনে জনে লিমিটিং ফ‍্যাকটরে পরিনত হচ্ছে।

কি করা যাবে এই ভাইরাসের লক্ষ্যস্থল আমাদের ফুসফুস আর এই ফুসফুসের দ্বারাই  পরিবেশের সাথে আমাদের দেহের অক্সিজেনের নির্গমন এবং বহির্গমন নিয়ন্ত্রিত। এই মহামারিতে মানুষ মারা যাচ্ছে, পরিবার শেষ হয়ে যাচ্ছে।গরীব মানুষ তো নাম নথিভুক্ত না‌ করেই চলে যাচ্ছে, তাদের শবদেহ চুল্লির বদলে জলে ভাসছে।কি করা যাবে করোনার মৃত রোগী পোড়ানোর খরচও অনেক। বড়লোকদের ও ভেন্টিলেশন থেকে একমো হয়ে বেঁচে ফিরলেও ৬০-৭০ লাখের প‍্যাকেজ অনিবার্য।তাই এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন এই ভাইরাসের শেষ কোথায়।  আমাদের বাস্তুতন্ত্রে যে কোন উদ্ভিদ বা প্রানী অথবা এই ক্ষেত্রে রোগ সৃষ্টিকারী জৈব উপাদান (ভাইরাস) যদি কোনো বাধা না পায় তাহলে সে অবাধে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বাস্তুতন্ত্রের নিয়মই হচ্ছে যখন কোনো জৈব উপাদান বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছিয়ে যায় তখন তার উপর বিভিন্ন রকমের বাধা আসে সেগুলো পরিবেশ থেকেও আসতে পারে, অন‍্য জীবকুল থেকেও আসতে পারে এমনকি স্বজাতি থেকেও আসতে পারে।এর ফলে সেই বর্ধনশীল Population সংখ‍্যায় কমবে, এটাকেই আমরা Ecological Balance বলি বা বাস্তুতন্ত্রের সাম‍্যতা।

 à¦à¦¬à¦¾à¦° আমরা যদি করোনা ভাইরাসের কথা ভাবি, এটা একটা অতি সংক্রমনশীল ভাইরাস যে বাস্তুতন্ত্রে অবাধ গতিতে ছড়িয়ে যাচ্ছিল, আমরা গত বছর প্রথমেই, এর অবাধ গতি ভাঙতে পরিবেশীয়  বাঁধা দিলাম, লকডাউন, মাস্ক পড়া, স‍্যানিটাইজার প্রয়োগ করা ইত্যাদি। এগুলোর কারনে ভাইরাস সংক্রমণ হ্রাস পেল। কিন্তু ভাইরাস কি Population এ শূন্য হয়ে গেল, না। কিছু থেকে গেল। এবার আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলাম। সমস্ত পরিবেশীয় বাঁধা সরিয়ে নিলাম। মাস্ক, স‍্যানিটাইজার,লকডাউন সব সরিয়ে নিলাম। বরং উল্টো কাজ করলাম তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করলাম মেলা, খেলা, সমাবেশ ইত‍্যাদি দিয়ে। ভাইরাস আবার এই বাস্তুতন্ত্রে আবার নিজের বৃদ্ধির পথ খুঁজে পেল। দৈনিক সংক্রমণ দশ হাজার থেকে চার লাখে পৌঁছিয়ে গেল। আমরা বললাম দ্বিতীয় ঢেউ। এবার আবার আমরা পরিবেশীয় বাঁধায় গেলাম, সেই লকডাউন, সেই মাস্ক,‌ সেই স‍্যানিটাইজার, তার সাথে যুক্ত হয়েছে ভ‍্যাকসিন। আবার ভাইরাস সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে, হয়ত আগামী à§§  মাসে এটা আবার পূর্বের মতো  গোটা দেশে দৈনিক দশ হাজার সংক্রমনে নেমে আসবে। 
 
 à¦à¦¬à¦¾à¦° এর সাথে দুটো জিনিস গুরুত্বপূর্ণ।

 

  •  à¦ªà§à¦°à¦¥à¦®à¦¤ প্রথমবারের সংক্রমণে আমাদের দেশে কুড়ি শতাংশ মানুষের মধ্যে করোনার আন্টিবডি তৈরি হয়েছিল, এই দ্বিতীয়বারে আমার প্রচুর সভা সমাবেশ করেছি তাই গতবারের থেকে আরো চারগুণ সংক্রামিত হয়েছে অর্থাৎ পপুলেশনে আরো চারগুণ আন্টিবডি।অর্থাৎ প্রায় একশো শতাংশ হার্ড ইমিউনিটি। অর্থাৎ পোষক কোষে ভাইরাসের সংক্রমণ এমনিই প্রতিরোধ হয়ে যাবে।করোনা শেষ, তৃতীয় ঢেউ আর নেই। 
  •  à¦à¦¬à¦¾à¦° আসি দ্বিতীয় পয়েন্ট যে সবসময় যে পরিবেশীয় বাধা সরে গেলেই যে ভাইরাস বা যে কোনো জৈব উপাদান ফিরে আসবে তা নাও হতে পারে। খুব সহজ কথায় আমি বা আপনি অন‍্যপাড়ায় মারামারি করতে গেলাম এলাকা দখলের জন্য এমন বাধা পেলাম, আর সে জায়গায় দ্বিতীয় বার যাবার কথা ভাবলাম না। কিন্তু ধরুন আমি বা আপনি বাধা পেয়ে ফিরে এসে নিজেদের শক্তিকে সুসংহত করে পুনরায় পাড়া দখল করতে গেলাম। এটাই এখানে বিজ্ঞানের ভাষায় হচ্ছে মিউটেশন। অর্থাৎ ভাইরাস নিজের প্রকৃতি বদলিয়ে আরো সুসংহত হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা যদি আবার বেপরোয়া হই, সমস্ত বাঁধা সরিয়ে নিই, তাহলে আবার তৃতীয় ঢেউ আসবে।তাই পরিকল্পিত লকডাউন, মাস্ক, স‍্যানিটাইজার, ভ‍্যাকসিন যা হার্ড ইমিউনিটি কে আরো সাপোর্ট দেবে সম্মিলিত ভাবে এই দেশে ও বিশ্বে করোনা ভাইরাসকে শেষ করবে। 

 
প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই কিছু দুর্বল ( পাড়া বার বার দখল করতে গিয়ে মার খাওয়ার পর যা হবে) করোনা ভাইরাস পপুলেশনে থেকে যাবে। কিন্তু আমাদের কিন্তু পরিবেশীয় বাঁধা দেবার কাজটা চালিয়ে যেতে হবে। তাহলেই জিতবো আমরা আর হারবে করোনা। কবির ভাষায় আমাদের দেখা হোক 'মহামারী শেষে/আমাদের দেখা হোক জিতে ফিরে এসে'।।

(লেখক - উদয়চাঁদপুর হাইস্কুলের শিক্ষক এবং প্রাবন্ধিক - ড. কুনাল সরকার মহাশয় )





Others News

অক্সিজেনের সিলিন্ডার দানের মাধ্যমে বিদ্রোহী কবি নজরুলকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন শিক্ষক সংগঠনের

অক্সিজেনের সিলিন্ডার দানের মাধ্যমে বিদ্রোহী কবি নজরুলকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন শিক্ষক সংগঠনের


অক্সিজেনের সিলিন্ডার দানের মাধ্যমে বিদ্রোহী কবি à¦¨à¦œà¦°à§à¦²à¦•ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন শিক্ষক সংগঠনের

জৈদুল সেখ, রঘুনাথগঞ্জ 

পশ্চিমবঙ্গ নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে সামাজিক বিধিনিষেধ মেনে পালিত হলো বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন।


সত্যিই বড়ো আনন্দের দিন, অথচ করোনার বিষাক্ত ছোবল, প্রকৃতির রুদ্ররোষ, যেকোন সময় আছড়ে পড়তে পারে, অপ্রতুল কোভিড ভ্যাকসিন। দ্রব্যমূল্যের ভয়ঙ্কর উলম্ফন। মানুষ  আজ বড়োই অসহায়।দিশাহীনতাও আমাদের গ্রাস করেছে। 
এইরকম এক সময়ে সমাজের উজ্জ্বল প্রাণের স্পন্দন, উচ্ছ্বলতায় ভরা মুমূর্ষু মানুষের পরম আত্মীয় রেড ভলেন্টিয়ার্সের আত্মপ্রকাশ। তাদের মহতী কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে মহান মানুষ অর্থাৎ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের জন্মদিন উপলক্ষ্যে নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির জঙ্গিপুর মহকুমা শাখার সদস্যরা অক্সিজেন সিলিন্ডার দান করলেন। 
 à¦à¦‡ তরুণ দলের পাশে দাড়িয়ে এক শিক্ষকের বক্তব্য। "আজ এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে চুরুলিয়ার দুখু মিঁঞা কে আমরা শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাইলাম।
  কবিতা গানের সম্রাট তুমি বিদ্রোহী নজরুলকে অন্তরের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ এর সাথে সাথে রঘুনাথগঞ্জ রেড ভলেন্টিয়ার্সকে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও আর্থিক সহায়তা এবং জঙ্গিপুর রেড ভলেন্টিয়ার্স কে আর্থিক সাহায্য তুলে দিলেন।
  
উল্লেখ্য ১৪২৮ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ২০২১ সালের নজরুল জন্ম-জয়ন্তী (১১ জৈষ্ঠ্য) নানা কারণে তাৎপর্যবাহী। করেনার প্রখর প্রতাপে ত্রস্ত পৃথিবীতে থেমে নেই অন্যায়, অবিচার। ফিলিস্তিন থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত পৃথিবীময় শোষণ, নির্যাতন, হত্যা, রক্তপাতে করোনা-বিপর্যস্ত পৃথিবী আর মানুষ অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্বিপাকে বিপন্ন। এমতাবস্থায় অনাচারের বিরুদ্ধে চিরবিদ্রোহী নজরুলের মানব অধিকারের রণহুঙ্কার বড়ই প্রাসঙ্গিক।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যার গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালির জীবন সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে। তিনি জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের এক দরিদ্র পরিবারের দুখু মিয়া হয়ে। আর মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি

 

আসুন মিঁয়ার সম্পর্কে আরো কিছু জেনে নিই যদি সময় থাকে 

 

প্রিয় কবি নজরুলের সাহিত্যচর্চার বিকাশ
প্রিয় কবি নজরুলের সাহিত্যচর্চার বিকাশ
কবি নজরুলের শিশু, কৈশোর ও সৈনিক জীবনের নানা বৈচিত্র্য পূর্ণতায় কাটিয়েছেন। সৈনিক জীবন শেষে ১৯১৯-১৯২০ সাল থেকে তাঁর শুরু হয় এক অনিশ্চত জীবনের অধ্যায়। ঐতিহাসিক বিদোহী কবিতা রচনা,নার্গিস ও প্রমীলার সাথে বিয়ে,কুমিল্লায় রবিবার আাসা,বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ,কবিতা,নাটক, প্রবন্ধ,গান,গজল,ইসলামী গান ইত্যাদি রচনার ক্ষেত্রে তিনি বাংলা সাহিত্যে তার বিকাশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।

পাশাপাশি সাংবাদিকতা,রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে অভিনয়, সুরকার,সংগীত পরিচালক,নাট্যকার, বিশ্বকবি বীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য এসবই উন্মেষ ঘটে। ১৯২০ সাল থেকে নার্গিস ও প্রমীলার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ। বুলবুলের মৃত্যু, মা জাহেদা খাতুনের মৃত্যু,ধূমকেতু রচনায়র দায়ে কারাবরণ,প্রভৃতি অধ্যায়গুলো কবিকে নানাভাবে উচ্চসিত উদ্বেলিত করে।

কবির জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাত, প্রেম-ভালোবাসা,বিপ্লবী মনোভাব, বিদ্রোহের আগুন,কবিতা,গল্প, প্রবন্ধে, গানে ,গজলে ও ইসলামী সঙ্গীতে তাঁর সৃজনশীলতার এ কবি নানা প্রতিভার উন্মেষ ও অধ্যায় সৃষ্টি হয়। বাংলা সাহিত্যের এতোগুলো শাখায় তাঁর যে অপরিসীম অবদান-তা পরিমাণ করাও অকল্পনীয়। সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন এক অনন্য প্রতিভার ব্যক্তি। পত্রিকায় সম্পাদনা ও সাংবাদিকতায় তিনি তাঁর গ্রন্থাবলী প্রলয় শিখা, রক্ততিলাল পথসুগম হয়।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের আরও একটি দিক বিশেষভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন, আর সেটি হচ্ছে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন। বাংলা সাহিত্যে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবেও পরিচিত। বাংলাভাষী মানুষের কাছে তাই তিনি এক বিদ্রোহের প্রতীকরূপে সমাদৃত। তবে সে বিদ্রোহ নিতান্তভাবে অন্য সকল বিদ্রোহ থেকে আলাদা। এ বিদ্রোহের পেছনে নেই কোনো অভিলক্ষ্য। কেবল নিপীড়িত মানুষের উদ্দেশে ধ্বনিত হয়েছে এ বিদ্রোহ। সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহও বিদ্রোহের কবিতা রচনা করেছেন, তবে তাঁদের প্রত্যেকের বিদ্রোহ ছিল মার্ক্সবাদী চিন্তাধারার নিরিখে প্রতিফলিত, এদিক থেকে নজরুল ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং তাঁর বিদ্রোহী চেতনাকে কোনোও ধরনের রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে কখনো ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
সমাজের সব বৈষম্যের মূলে তিনি কুঠারাঘাত করেছেন নিচের দুই চরণের মাধ্যমে—

‘গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান!’

নিখিল ভারতে স্বাধীনতাকামী মানুষের মধ্যে প্রথম স্বাধীনতার বীজ বোপিত হয়েছিল নজরুল ইসলামের লেখনীর মাধ্যমে এমনটি দাবি করলেও ভুল হবে না। সত্যি কথা বলতে গেলে, ১৯২০ সালের ১২ জুলাই ‘নবযুগ’ নামের একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। এই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ওই বছরই এই পত্রিকায় ‘মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন, যার জন্য পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়। নজরুল ব্রিটিশ সরকারের জনরোষে পতিত হন এবং রাষ্ট্রদোহের অভিযোগে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতাকামী মানুষের উদ্দেশে তাঁর লেখা—
‘কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট
শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।
ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।’

বলতে গেলে কাজী নজরুল ইসলাম যখন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কলম ধরে দখলদার শ্বেতাঙ্গ ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে ‘সেই দিন হব শান্ত’ লিখেন, সেটিই ভারতের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার ডাক। তাই নজরুলকে ছাড়া এ ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে কল্পনা করা কখনো সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

বাস্তবিক অর্থে বলতে গেলে বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রি থাকলেও জ্ঞানের কোনো ডিগ্রি নেই। জ্ঞান যেমনিভাবে ডিগ্রিবিহীন, ঠিক তেমনি সীমাহীন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সবার মধ্যে এই নির্মম বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে তুলে ধরেছেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাই তিনি খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে না পারলেও বাংলা সাহিত্যকে একাই তিনি নিজ হাতে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছেন। শব্দ চয়ন থেকে শুরু করে বর্ণনার ভঙ্গি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য পাণ্ডিত্য দেখিয়েছেন। তাঁর তুলনা তিনি নিজে, বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনেও তাঁর সমতুল্য কবি খুব কম রয়েছেন। মাত্র ৪২ বছর বয়সে তিনি মস্তিষ্কের এক দুরারোগ্য ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হন, তাঁর সাহিত্যচর্চায় ছেদ পড়ে এবং তিনি ধীরে ধীরে তাঁর বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। সত্যি কথা বলতে গেলে, তাঁর সাহিত্যচর্চার সময় ছিল ২০ থেকে ২৪ বছরের মতো, যেটা নিতান্ত কম বলতে হবে। সংক্ষিপ্ত এই সময়টুকুতেও তাঁকে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে। এরপরও তিনি তাঁর লেখনীর দ্বারা গোটা বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা এখনো যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারিনি। দুখু মিঞা আমাদের মধ্যে এখনো অনেকটা অনাদরে রয়ে গিয়েছেন, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আরও অধিক গবেষণার প্রয়োজন। পাশাপাশি তাঁর সৃজনশীল রচনাগুলোকে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশসহ বিদেশি বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা প্রয়োজন।

সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, কাজী নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমেদ—এই ত্রয়ীর জন্ম না হলে বাংলার মুসলমানরা আজও অন্ধকারাচ্ছন্ন থেকে যেত। একই সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম না থাকলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের জাঁতাকল থেকে সত্যিকার অর্থে আমরা কতটুকু মুক্ত হতে পারতাম, সে প্রশ্নও তোলার সুযোগ রয়েছে। তাই নজরুলচর্চা থেকে সরে আসা মানে মনন জগৎকে আবারও সেই ঔপনিবেশিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া। একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান হিসেবে আমাদের যে গৌরবজ্জ্বল সোনালি অতীত রয়েছে, সেটিও বিলীন হয়ে যাবে আমাদের মনোজগৎ থেকে, যদি না আমরা তাঁর সৃষ্টিকর্মকে যথার্থভাবে তুলে ধরতে না পারি। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে আমাদের গুরুত্বসহকারে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীল কর্মের প্রতি যত্নবান হতে হবে এবং সেগুলোকে সংরক্ষণের পাশাপাশি বিশ্বদরবারেও যাতে আমরা তাঁর রচনাকে ছড়িয়ে দিতে পারি, সে ব্যাপারেও আমাদের তৎপর হতে হবে।