চতুর্থ স্তম্ভে ফাটল! এঁরা নির্বাচনের আগে এক নৌকা থেকে অন্য নৌকায় যান! সাংবাদিক সুচন্দ্রিমার প্রসঙ্গে কৌস্তব রায়
চেতনা নিউজ
চতুর্থ স্তম্ভে ফাটল আজকের নয়, বহুকালের। আগে সে ফাটলে শ্যাওলা জমতো, ফাটল বড় হলে ঘুঘুপাখির বাসা হত, তারপর ঘুঘুপাখির বাচ্চা খেতে জাত কেউটের দলও জুটে গেল। এখন ফাটল অনেক বড়, সেখানে এখন নানান রকমের বাসিন্দা। এঁদের বেশিরভাগই দিল্লি কলকাতার লবি সামলান, সেই দৌলতেই টাকা কামান, সাংবাদিকতাটা ওপরের খোলসও বলাই যায়, এঁরা নির্বাচনের আগে এক নৌকা থেকে অন্য নৌকায় যান, যাব যাব করেন, বা সেই সময়টুকু থম মেরে বসে থাকেন, শিস দেন। নির্বাচনের পর চিত্র পরিস্কার হলে আবার মাঠে নেমে পড়েন। মমতার ওই বক্তৃতার পরেই ঘুরে গেলো নির্বাচনের চালচিত্র, গোছের পোস্ট এডিট লেখেন, আবার নোয়ার নৌকায় উঠে আগামী পাঁচ বছর দুধ ঘি মদ মধুর ব্যবস্থায় লেগে পড়েন। ঘটনাচক্রে এঁরা সব সিনিয়ার লোকজন, কেউ কচি নন, কেউ আবার ইউটিউবার, দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।
এই গোত্রের লোকজনের আজ ছুটি, ইয়াস আসবে, সকালে দুপুরে বিকেলে রাতের আয়োজন দিন দুই আগে থেকেই করা আছে, টিভি খোলা, ইয়াস উদযাপন যাকে বলে। এদিকে ইয়াস ঠিক যেরকম আসবে ভাবা গিয়েছিল সেরকমও নয়, কিন্তু কোস্টাল এলাকায় বিরাট ক্ষয়ক্ষতি, তো তাতে কী? এনারা তো রাজধানীর সাংবাদিক। খবরে দেখা গেলো একজন রিপোর্টার চলে গেছেন সমুদ্র উপকূলে, সেখান থেকে রিপোর্টিং করছেন, বিরাট ঢেউ এসে টেনে নিচ্ছে তাঁদের গাড়ি, তাঁরা প্রাণ বাঁচিয়ে কোনওক্রমে চলে আসতে পারছেন, স্বাভাবিক ট্রমা রিপোর্টারের মুখে, চতুর্থ স্তম্ভ অনুষ্ঠানের খাতিরে পরিচিত মুখ সুচন্দ্রিমা কাঁদছে, ট্রমাটাইজড, আমি থাকলে বলতাম কাঁদিস না, তোর অভিজ্ঞতাটা বল, মানুষ শুনতে চাইছে।
ব্যস, হাতে দুপুরের ভোদকা, ফাটলের কেউটে, দাঁড়াশ, ঢ্যামনা, ইঁদুর ছুঁচোরা মাঠে নেমে পড়ল, একে সাংবাদিকতা বলে? এদের পাঠিয়ে দিয়ে টি আর পি তোলার চেষ্টা চলছে। এদের কে বোড়ের মত এগিয়ে যারা স্টুডিওতে বসে কপচাচ্ছে তাঁরা কারা? সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলেই যেতে হবে? কেন দীঘার হোটেলের ছাদ ছিল না? একদিনে সাংবাদিক হইতে গেলে কী করিতে হইবে, শিখিয়ে দিলেন কারা? যারা সাংবাদিকতার নামে আসলে নেহাতই দালাল, এবং কিছু মানুষ তাঁদের এই অসার যুক্তি নিয়ে ফেসবুকে, সোশ্যাল মিডিয়ায়। অক্ষমের হাহুতাশ, ক্ষমতার অলিন্দে ঘুরে বেড়ানো আড়কাঠিদের হঠাৎ সমবেত চিৎকার।
এঁরাই বরখা যখন কারগিল ফ্রন্টে গুলি গোলার মধ্যে বসে রিপোর্টিং করে, তখন ইল্লি ইল্লি দেখেছিস, দেখেছিস করে, এঁরাই ফক্স এর সাংবাদিক অ্যাভাল্যান্স এর সামনে দাঁড়িয়ে ক্যামেরায় কথা বলছে দেখে আঙুল তুলে দেখায়, দেখো, ওই হল সাংবাদিকতা। তাঁরাই আজ সুচন্দ্রিমার ভেসে যাওয়ার পেছনে চ্যানেল মালিকের, এডিটরের টি আর পি প্রেম দেখছেন সাংবাদিকতা নয়।
হ্যাঁ আমরা সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছি, মানুষের চোখ যেখানে যেতে চায় সেখানে পাঠিয়েছি, মানুষ যা দেখতে চায় তাই তুলে আনার নির্দেশ দিয়েছি, তার সঙ্গে সব রকম সুরক্ষার দায়ও নিয়েছি, এই মুহূর্তে ১৩ জন রিপোর্টার বিভিন্ন জায়গা থেকে কলকাতা টিভির খবর পাঠাচ্ছেন, তাঁরা গ্রাউন্ড জিরো থেকেই খবর পাঠাচ্ছেন, সেখান থেকেই তাঁদের খবর পাঠানোর কথা। সুচন্দ্রিমা এর আগেও এই কাজ করেছে, ভালো ভাবেই করেছে, এবারেও করেছে, যোগ হয়েছে একটা দুর্ঘটনা যা এই কলকাতায় অফিসের সামনে একটা রোড অ্যাকসিডেন্ট এরই মত স্বাভাবিক। আমাদের রিপোর্টারদের ওপর আমার আস্থা আছে, ভরসা আছে, প্রতিবার বের হবার সময় তাঁদের বলে দেওয়া হয়, খবর করতে যাও, খবর হতে নয়, এ কথা তাঁরা মাথায় রাখে, তারপরে তাঁরা পৌঁছয় গ্রাউন্ড জিরোতে, থাকে খবরের খিদে, আরও নতুন খবরের জন্য শরীরের অ্যাড্রেনালিন চলকে ওঠে, ঝুঁকি নেয়, সেটাই সাংবাদিকতা।
লালকৃষ্ণ আদবানির জামার হাতা গুটিয়ে দেওয়া, কিংবা জগত প্রকাশ নাডডার বক্তৃতা ঠিক করে দেওয়া অথবা সকালে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে চা জলখাবার খেয়ে সারাদিন কাটিয়ে রাতের অন্ধকারে মুকুল রায় কিংবা কৈলাস বিজয়বর্গীয় কাছে ঘানির সরষের তেল ঢালতে যাওয়া ‘আসোল পোরিবরতন’ চাওয়া খাম সাংবাদিকদের এই অ্যাড্রেনালিন ঝরেছে কখনও?
আবার ঝড় আসবে, আবার নির্বাচন আসবে, পুলিশের লাঠিচার্জ থেকে দাঙ্গাবাজদের মাঝখানে গিয়েই কাজ করবে রিপোর্টাররা, কাজ করবে সুচন্দ্রিমা, আবার সেই খবর দেখানো হবে আমাদের চ্যানেলে, সেটাই জবাব, আপাতত ওই ফাটলের যাবতীয় সরীসৃপদের উপেক্ষা করুন।
Kaustuv Ray
Editor, Kolkata TV